কবি

কবি আবদুল হাই মাশরেকীর সংক্ষিপ্ত জীবনী

newsforever24 কবি

কবি আবদুল হাই মাশরেকীর সংক্ষিপ্ত জীবনী

গ্রাম বাংলায় জনপ্রিয় পালাগান রাখালবন্ধু, জরিনা সুন্দরী, কাফন চোরা, বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার জারী, দুখু মিয়ার জারী, আল্লা মেঘ দে পানি দে, গলার হার খুলে দে ওগো ললিতে, কাঙ্খের কলসি গিয়াছে ভাসি, ফাদে পড়িয়া বগা কান্দে, মাঝি বায়া যাওরে, আমার বাড়ি যাইও বন্ধু বইতে দিমু পিড়া এরকম অসংখ্য গানের স্রষ্টা আবদুল হাই মাশরেকী তিরিশ দশকের মাটি ও মানুষের কবি। আবদুল হাই মাশরেকী মূলতঃ এদেশের সাধারণ মানুষের জীবনের আশা-আকাক্ষার রূপকার ও কৃষক জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিত্বকারী কবি। কবি আবদুল হাই মাশরেকী ১৯০৯ সালে ১ এপ্রিল, সার্টিফিকেট অনুযায়ী ১৯১৯ সালে ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জের কাঁকনহাটি গ্রামে তাঁর মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যুবরণ করেন ৪ ডিসেম্বর ১৯৮৮ সালে নিজবাড়িতে। পিতা- ওসমান গণি সরকার। তিনি জমিদার বিরোধী আন্দোলনের তেজোদীপ্ত নায়ক ছিলেন। মাতা- রহিমা খাতুন। কলকাতার বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা গবেষক মিহির আচাৰ্য্য তাঁর ১৯৯০ সালে প্রকাশিত ‘সাহিত্যে প্রগতি ও পরাগতি’ গবেষণামূলক গ্রন্থে বাংলাদেশের কবিতা জগতকে ১৯১৭ হতে ১৯৩৬ সালে যাঁরা প্রতিষ্ঠিত কবি তাঁদের মধ্যে আবদুল হাই মাশরেকীকে পল্লীজীবন ও লোকগাঁথা কবি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে আবদুল হাই মাশরেকী সক্রিয়ভাবে নিজেকে যুক্ত করেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে ‘ওরে আমার ঝিলাম নদীর পানি বিখ্যাত গানের শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে তঙ্কালীন পাকিস্তান সরকারের রাষ্ট্রীয় ‘তঘমাই ইমতিয়জ’ পুরস্কার ঘোষণা করলে তাৎক্ষণিক আবদুল হাই মাশরেকী তা প্রত্যাখান করেন। ১৯৬৭ সালে তৎকালীন সরকারে নির্দেশে কিছুসংখ্যক সাহিত্যিক রবীন্দ্র বিরোধী স্বাক্ষর আবদুল হাই মাশরেকীর কাছে সংগ্রহ করতে গেলে তিনি স্বাক্ষর না দিয়ে ধীক্কার জানিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। উপমহাদেশের বিখ্যাত অনুবাদক ননী ভৌমিক আবদুল হাই মাশরেকীর কুলসুম গল্পগ্রন্থটি রুশ ভাষায় রূপান্তর করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বপরিবারে ঢাকার গ্রীণ রোড ও পরে সেন্ট্রাল রোডে অবস্থান করেন। যুদ্ধ চলাকালীন পাকবাহিনীর একটি দল কবি আবদুল হাই মাশরেকীর বাসা সার্জ করে। সেসময় কবি পালিয়ে গিয়েছিলেন। যৌবনের প্রথম দিকে তিনি কোলকাতায় এইচএমবি'তে পাঁচ বছরের চুক্তিভিত্তিতে গান রচনা করেন। এরপরও ঢাকার এইচএমবি'তে গান রচনার জন্য তাঁর সাথে কয়েক বছরের চুক্তি হয়। তবে কর্মজীবনে প্রথমে শিক্ষকতা ও পরে জুট রেগুলেশনে কবি আবদুল হাই মাশরেকী চাকুরি করেন। এরপর দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় সহ-সম্পাদক, দৈনিক পাকিস্তান (দৈনিক বাংলা), পরবর্তীতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘কৃষিকথা' পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৭৬ সালে অবসরে যান। আবদুল হাই মাশরেকী শুধু গ্রামীণ বিষয়বস্তু নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করে গণমানুষকে উজ্জীবিত করেননি। তিনি এ যুগের মানুষকে গণতন্ত্রের মন্ত্রে দীক্ষিত করে তুলেছেন তাঁর রচিত গান দিয়ে-“এসো গণতন্ত্র গড়ে তুলি/নতুন দিনের এসো করব কায়েম রাজ-কলুষ হীনের...।' 'চাষার কুটুম শস্য কণা। মন্ত্রী হইছে অনেক জনা / দুখের দিনে তাদের দেখা নাই...।' শহীদদের স্মরণে ‘তারা মরে নাই তারা যে অমর নহে গো নহে এ তাদের কবর। দেশাত্ববোধক গান- বাংলা মা তোর শ্যামল বরণ / হৃদয় আমার করল হরণ। আধুনিক গান- ‘একদিন হবে ভুলিতে/ শুকাবে মালিকা ধুলিতে’, ‘একটি কথা শুনবে যদি শোনো। এছাড়াও কবি আবদুল হাই মাশরেকীর কালোত্তীর্ণ কবিতা রয়েছে- এই বীভৎস হানাহানি আর- এই মৃত্যুকে স্বীকার করিনি কভু মানুষের পথ...। শ্বাপদ হিংস্র নখরে বিঁধেছে তবু/ তবু তো রক্তে ভিজে গেলো রাজপথ......। দেশাত্মবোধক কবিতা ‘হে আমার দেশ’ হৃদয়ের প্রেম দিয়ে তোমাকে তো ভালবাসি হে দেশ আমার...। স্বাধীনতাউত্তর দেশের দৃশ্যপটের উপরে- এই ত পেয়েছি মাকে বাড়ির সামনে তার নতুন কবর বধ্যভূমি ঘুরে ঘুরে/ কালোজিরে ধানক্ষেত তীরে এসে দেখি বিধ্বস্ত সকলি.....।' অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তাঁর সনেট- পশ্চিমের গোর থেকে এইসব অপচ্ছায়া/ আসে চুপি, কথা বলে বাঁধানো কঠিন দাতে।/ উটপাখি কবুতর নিরীহ কোকিল কাক/ বেড়াল ছানার মতো কখনো-বা ধরে কায়া/ প্রতি চোখ নির্বিবাদ-সব কথা রাখে আঁতে/ সমবেত কণ্ঠে শুধু শোনায় আজব ডাক।' কবি আবদুল হাই মাশরেকীর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: রাখালবন্ধু (পালাগান), জরিনা সুন্দরী (পালাগান), ডাল ধরিয়া নুয়াইয়া কন্যা (পল্লীগীতিকা), হযরত আবু বকর (রাঃ) (পুঁথি কাব্য), দুখু মিয়ার জারী, ভাটিয়ালী (গীতিনাট্য ও কাব্য), অভিশপ্তের বাণী (খণ্ড কাব্য), দেশ দেশ নন্দিতা (কাব্য), কাল নিরবধী (কাব্য), হুতুম ভুতুম রাত্রি (শিশুতোষ) কিছু রেখে যেতে চাই (আধুনিক কাব্য), হে আমার দেশ (আধুনিক কাব্য) মাঠের কবিতা মাঠের গান (কাব্য), কুলসুম (গল্প) বাউল মনের নকশা (গল্প), মানুষ ও লাশ (গল্প), নদী ভাঙে (গল্প), সাঁকো (নাটক), নতুন গাঁয়ের কাহিনী (নাটক), আকাশ কেন নীল (অনুবাদ)। উল্লেখ্য, এই কবির দুর্লভ বহু পল্লী ও আধুনিক গান, গীতিনাট্য, জারী, কবিতা, গল্প, নাটক ও অনুবাদসহ ৩০ দশক থেকে আশি দশকের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। তবে তাঁর বহু জনপ্রিয় গান এখন অনেক মিডিয়ার দায়িত্বহীন কর্মকর্তারা সংগ্রহ ও বেনামে প্রচার করে আসছে। এসব লেখা সংগ্রহ করে দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি ভাণ্ডারকে আরো সমৃদ্ধ করার দায়িত্ব আমাদের। আসুন, সবাই মিলে কবি আবদুল হাই মাশরেকীর হারিয়ে যাওয়া লেখাগুলোর সন্ধান করি এবং আগামীর প্রজন্মের হাতে তুলে দেই।

   

 


ফটোগ্যালারী